
ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরে ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি নীতি ২০২৪ এর দাবিতে সামাজিক আন্দোলনে সাংবাদিক সমাজকে সম্পৃক্তকরণ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ক্যাব (কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ) উদ্যোগে সাংবাদিকদেরকে নিয়ে রংপুরে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
২১ জানুয়ারি বুধবার রংপুর ইএসডিও ট্রেনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার কামাল কাছনা সম্মেলন কক্ষে সকাল হতে দুপুর পর্যন্ত এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালাটিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতি জনস্বার্থ ও অধিকার বিরোধী হওয়ায় জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে একদিকে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহে লুণ্ঠনমূলক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটে এবং মূল্যহার ও ভর্তুকি বৃদ্ধি চরমে পৌঁছায়, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় অর্থনীতি ও জনজীবন বিপন্ন হয়। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও এই অবস্থার উপশম হয়নি। পাওয়া যায়নি প্রত্যাশিত প্রতিকার। বিদ্যমান সমস্যাগুলো শুধু প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে সামাজিক ও ন্যায্যতার প্রশ্ন জড়িত। তদুপরি, জ্বালানি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জ্বালানি ও জ্বালানি রূপান্তরের বাস্তবতা জ্বালানি হচ্ছে আধুনিক সভ্যতার প্রাণশক্তি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে শিল্প ও কৃষি প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্বালানির অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সকল জ্বালানির উৎস সূর্য হলেও ভূমি ও সমুদ্রের অভ্যন্তরে বিদ্যমান জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদের মালিকানা জনগণের।বাংলাদেশের সংবিধান এই মালিকানাকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এই সম্পদকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির ক্ষমতাবান এলিট ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী জনগণের অধিকার খর্ব করে এক স্বার্থান্বেষী চক্র সৃষ্টি করেছে- যারা সাধারণত ‘অলিগার্ক’ নামে পরিচিত। ফলে জ্বালানি খাত জনগণের পরিবর্তে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি। এই প্রেক্ষাপটে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) প্রস্তাবিত বাংলাদেশ জ্বালানি রূপান্তর নীতি, ২০২৪ একটি যুগোপযোগী উদ্যোগ যার লক্ষ্য জ্বালানি অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জ্বালানি সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করে –
১/ বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত হতে পুনরায় সেবাখাত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সরকারি সেবা মুনাফামুক্ত নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ কস্ট প্লাস নয় কস্টভিত্তিক নিশ্চিত করা।
২/ জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে প্রাথমিক জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বর্তমানের তুলনায় গড়ে কমপক্ষে ৫% কমানো নিশ্চিত করা।
৩/ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত বৃদ্ধি দ্বারা ৫ বছরে গড়ে ১৫% বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি।
৪/ এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ৫ বছরের জন্য রহিত করা এবং কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি নিষিদ্ধ করা।
৫/ গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে গণশুনানির ভিত্তিতে স্থলভাগের শতভাগ গ্যাস বাপেক্সসহ দেশীয় কোম্পানি দ্বারা শতভাগ অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করা।
৬/ গণশুনানির ভিত্তিতে ছাতক (পূর্ব) ও ভোলা/দক্ষিণাঞ্চলের অব্যবহৃত গ্যাস ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন নিশ্চিত করা।
৭/ আদানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করানো এবং আদানির বিদ্যুৎ আমদানি বদ নিশ্চিত করা।
৮/ ক্যাবের দায়েরকৃত স্পিডি আয় ২০১০ রহিতকরণ অধ্যাদেশ ২০২৪ সংক্রন্ত রিট মামলা দ্রুত নিস্পত্তি করে এই আইনের আওতায় সম্পাদিত সকল চুক্তি ও লাইসেন্স বাতিলসহ সকল ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা।
৯/ ওই সকল চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের যত আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্টদের নিকট থেকে আদায় নিশ্চিত করা।
১০/ জ্বালানি খাতসংশিষ্ট দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসাবে বিচার নিশ্চিত করা।
১১/ লুষ্ঠনমূলক ‘ব্যয় ও মুনাফা’ মুক্ত করে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে বিদ্যমান মূল্যহার কমানো।
১২/ বিইআরসি’র জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিইআরসি’র বিরুদ্ধে আনীত ক্যাবের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং ক্যাব প্রস্তাবিত বিইআরসি’র আইন সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, এবং
১৩/ আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসা সুরক্ষায় প্রণীত জ্বালানি সনদ চুক্তি ১৯৯২ স্বাক্ষরে সরকারকে বিরত রাখা।
উপরোক্ত ১৩ দফা দাবি নিয়ে কর্মশালাটিতে বিশদ আলোচনা করা হয়। এতে রংপুরের ৩০ জন গণমাধ্যম কর্মী ও ক্যাব সদস্য সহ মোট ৫০জন অংশগ্রহণ করেন।
রংপুর জেলা ক্যাবের সভাপতি মোঃ আব্দুর রহমানের সভাপতিত্বে কর্মশালার উদ্দেশ্য ও ক্যাব কার্যক্রম সম্পর্কে পরিচিতি তুলে ধরেন ক্যাব এর প্রকল্প সমন্বয়কারী মারুফা কলি, শক্তি সঞ্চালন নিয়ে কথা বলেন ক্যাব এর গবেষণা সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার শুভ কিবরিয়া, শক্তি ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনা করেন ক্যাব এর গবেষণা সহযোগী আনিস রায়হান, ন্যায্য শক্তি সঞ্চালনের উপর সীমা নির্ধারণের ১৩ দফা দাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ক্যাব যুব সংসদ সদস্য আরাফি সিরাজী অন্তর ও ন্যায্য শক্তির পরিবর্তনে সাংবাদিকের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন শিক্ষক, লেখক, গবেষক গুহর নাঈম ওয়ারা।
কর্মশালার শেষ পর্যায়ে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে উন্মুক্ত আলোচনা হয়।



