‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ কী, এটি কতটুকু কার্যকর

Chif Editor

অনলাইন ডেস্ক :- দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ আলোচনায় এসেছে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ বা ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’। বিএনপির সরকার গঠনের প্রাক্কালে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতাদের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের ঘোষণায় এই আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, ছায়া মন্ত্রিসভা কী? সংসদীয় গণতন্ত্রে এটি আসলে কতটুকু কার্যকর?

গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই–শাল্লা) আসনের প্রার্থী শিশির মনির ঘোষণা দেন, ‘আমরা একটি শ্যাডো ক্যাবিনেট গঠন করব, ইনশাআল্লাহ।’ তার এ ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ জনগণের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।

এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সাজীব ভূঁইয়াও অনুরূপ বক্তব্য দেন। তিনি রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে ফেসবুকে লেখেন, ‘আমরা একটি শ্যাডো ক্যাবিনেট গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। শ্যাডো ক্যাবিনেট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকিতে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে।’

ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী?
দেশের রাজনীতিতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ হতে পারে নতুন গণতান্ত্রিক চর্চা।

সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ভূমিকা রাখতে পারে।যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ হলো জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে বিরোধী দলের নেতার নির্বাচিত একটি টিম, যারা সরকারে থাকা মন্ত্রিসভার সমান্তরালে দায়িত্ব পালন করেন। শ্যাডো ক্যাবিনেটের প্রতিটি সদস্যকে দলের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট নীতিখাতের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেই খাতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ও চ্যালেঞ্জ করেন। এভাবে সরকারি বিরোধী দল নিজেদের বিকল্প ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শ্যাডো ক্যাবিনেট শুধু সমালোচনার একটি হাতিয়ার নয়। এটি বিরোধী দলের নেতাদের জন্য এক ধরনের প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করে, যেখানে দলীয় সদস্যরা প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন—যা ভবিষ্যতে সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করে।

এ পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়েস্টমিনস্টার ধারার গণতন্ত্রে। দেশটির শ্যাডো ক্যাবিনেট নিয়মিতভাবে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং সংসদে মন্ত্রীদের প্রশ্নের মুখোমুখি করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়াতেও শ্যাডো ক্যাবিনেট সরকারি সিদ্ধান্তসমূহ পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানে ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে কোনো বিধান নেই। ফলে এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক দলের উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলে থাকাকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু নেতাকে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক দায়িত্ব দিলেও তা স্থায়ী বা সুসংগঠিত কাঠামো পায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সংসদীয় চর্চার সীমাবদ্ধতার কারণে এ ব্যবস্থা কার্যকর রূপ পায়নি।

সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে যদি সংসদীয় সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর একটি রাজনৈতিক অনুশীলনে পরিণত হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক আস্থার ওপর।

ছায়া মন্ত্রিসভা- বাংলাদেশে এখনও একটি ধারণা; তবে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার হলে এটি বাস্তব কাঠামোতেও রূপ নিতে পারে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। তারা ২০৯টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। এর মধ্যে জামায়াত এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফ্রেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নিতে যাচ্ছে।

Leave a Reply