
৭ জানুয়ারি ২০১১—এই তারিখটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্মৃতিতে খোদাই হয়ে থাকা একটি ক্ষত। কুড়িগ্রাম জেলার অনন্তপুর–দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠিতে কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশার ভেতর, কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ঝুলে থাকা একটি কিশোরীর নিথর দেহ আমাদের সামনে নগ্ন করে দিয়েছিল সীমান্তে মানবিকতার করুণ পরাজয়। সেই নাম—ফেলানী খাতুন—আজ আর কেবল ব্যক্তির নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রশ্ন, একটি মানচিত্রের ওপর লেখা রক্তাক্ত টীকা।
ফেলানী কোনো ‘অপরাধী’ ছিল না। পনেরো বছরের এক কিশোরী, জীবনের শুরুতেই জীবিকার সন্ধানে বাবার সঙ্গে দিল্লিতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেছিল। দেশে ফেরার পথে ছিল বিয়ের স্বপ্ন, নতুন জীবনের আশা। সেই ফেরার পথেই, মই বেয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার মুহূর্তে, একটি গুলি তার বুক বিদ্ধ করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে সে পড়ে যায়নি—সে ঝুলে ছিল। আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর দিকে হেঁটে গেছে, নিজের বাবার চোখের সামনে। এরপরও সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে তার নিথর দেহ ঝুলে ছিল কাঁটাতারে—রাষ্ট্রীয় ‘সাফল্য’ হিসেবে প্রদর্শিত এক শিশুর লাশ।
এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি কাঠামোগত সহিংসতার প্রতীক। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রটি জন্ম নিয়েছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। কিন্তু জন্মের পরপরই যে বাস্তবতা সামনে আসে, তাতে দেখা যায়—মানচিত্রে স্বাধীনতা মানেই বাস্তবে নিরাপত্তা নয়। বিশেষ করে দীর্ঘ, জটিল এবং গ্রামঘেঁষা সীমান্তে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক বারবার মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ—বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্তগুলোর একটি। গ্রাম, মাঠ, নদী, বসতবাড়ি—সবকিছুর ভেতর দিয়ে কাটা এই সীমান্তে মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যাতায়াত করেছে। ১৯৪৭-এর দেশভাগ এই স্বাভাবিক মানবিক চলাচলকে কাঁটাতার, প্রহরা আর বন্দুকের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে বেড়েছে সামরিকীকরণ, আর কমেছে মানবিক বোধ।
পরিসংখ্যান এই বাস্তবতার নীরব সাক্ষ্য দেয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত দুই দশকে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে শত শত বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশই নিরস্ত্র গ্রামবাসী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ। গুলি, নির্যাতন, পিটুনি—সব মিলিয়ে সীমান্ত হত্যা একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামী-লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে এগুলো প্রায়ই ‘চোরাচালান দমন’ বা ‘অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ’-এর নামে বৈধতা পায়, কিন্তু নিহতদের অধিকাংশই কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রাণ হারান।
ফেলানী হত্যাকাণ্ড এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও দৃশ্যমান উদাহরণ। কারণ, এখানে মৃত্যু শুধু ঘটেনি—তা প্রদর্শিত হয়েছিল। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা দেহ বিশ্বমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল, নড়েচড়ে বসেছিল আন্তর্জাতিক বিবেক। চাপের মুখে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিচার শুরু করতে বাধ্য হয়। অভিযুক্ত ছিলেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচারে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। খালাস পেয়ে যান বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স–এর সদস্য অমিয় ঘোষ। আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণিত না হলেও, নৈতিক বিচারে এই রায় সীমান্তে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকেই শক্তিশালী করেছে।
এই দায়মুক্তি শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। সীমান্তে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির নামে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী। জাতিসংঘের মৌলিক নীতিমালা স্পষ্টভাবে বলে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বশেষ উপায় হিসেবে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করতে হবে। অথচ বাংলাদেশের সীমান্তে গুলি যেন প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানে প্রশ্নটি কেবল ভারতের আচরণ নিয়ে নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়েও। একজন নাগরিক সীমান্তে নিহত হলে, সেটি শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে আঘাত। কূটনৈতিক প্রতিবাদ, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার আলোচনা, মানবাধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা কতটা কার্যকর, সে প্রশ্ন বারবার উঠে আসে। নীতিগত অবস্থান আর বাস্তব প্রয়োগের ফারাক সীমান্তের মাটিতেই রক্ত হয়ে ঝরে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক—বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি বণ্টন, নিরাপত্তা সহযোগিতা—সবকিছুই এতে জড়িত। এই জটিল সম্পর্কের ভেতরে সীমান্ত হত্যা প্রায়ই ‘সংবেদনশীল বিষয়’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মানবজীবনের প্রশ্নে সংবেদনশীলতা মানে নীরবতা হতে পারে না। ফেলানীর মতো মৃত্যুগুলো দেখিয়ে দেয়, অসম ক্ষমতার সম্পর্কে নীরবতা শেষ পর্যন্ত দুর্বলকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একটি মানচিত্র রাষ্ট্রের সীমা নির্ধারণ করে, কিন্তু মানবিকতার সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। কাঁটাতার রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সেটি যদি শিশুর লাশ ঝুলে থাকার মঞ্চ হয়ে ওঠে, তবে সেই নিরাপত্তার নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ফেলানীর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সার্বভৌমত্ব শুধু পতাকা আর মানচিত্রে নয়; তা প্রতিদিন পরীক্ষিত হয় নাগরিকের নিরাপত্তায়, মর্যাদায়, জীবনের অধিকারে।
আজ ফেলানীর নাম ইতিহাসে থেকে গেছে একটি স্থায়ী সাক্ষ্য হিসেবে—একটি সীমান্ত, একটি কাঁটাতার, আর একটি রাষ্ট্রীয় হত্যার প্রতীক। এই নাম আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে: আমরা কি সীমান্তকে মানুষের ঊর্ধ্বে তুলে ধরছি? নাকি মানুষের জীবনকেই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে মানছি?
যদি ফেলানীর মৃত্যু আমাদের নীতিতে, কূটনীতিতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন না আনে, তবে এই ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে। আর প্রতিবারই নতুন কোনো নাম যুক্ত হবে—আরেকটি কিশোরী, আরেকটি পরিবার, আরেকটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার গল্প। স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পরও যদি বাংলাদেশের নাগরিক সীমান্তে নিরাপদ না থাকে, তবে স্বাধীনতার অর্থ পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার সময় এসে গেছে।
লেখক :-
মীর্জা ফসিহ উদ্দিন আহমেদ



