
নিজস্ব প্রতিবেদ :- বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিমান ক্রয়সংক্রান্ত সম্ভাব্য আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক–৩ যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধানের সাম্প্রতিক ইসলামাবাদ সফরের পর এই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
যদিও এখনো বাংলাদেশ সরকার বা বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি, তবুও সম্ভাব্য এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভারতের গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে এবং নয়াদিল্লি একে “জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ” করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেএফ-১৭: পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পের সাফল্য জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানটি পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (PAC) এবং চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি। প্রকল্পটির সূচনা হয় ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি, এবং প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন হয় ২০০৩ সালে। মাত্র এক দশকের মধ্যেই বিমানটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হয়।
বর্তমানে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বহরে আনুমানিক ১৫০টির বেশি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে। ব্লক–৩ সংস্করণটি আগের সংস্করণগুলোর তুলনায় উন্নত অ্যাভিওনিক্স, অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডার, আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম বলে বিবেচিত।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, একটি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের আনুমানিক মূল্য ২৫ থেকে ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে, যা একই প্রজন্মের পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই তুলনামূলক কম খরচ এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতাই একে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। নাইজেরিয়া, মিয়ানমার ও ইরাক ইতোমধ্যে জেএফ-১৭ সংগ্রহ করেছে বা সংগ্রহের চুক্তি করেছে। ভারতের তেজস প্রকল্প: দীর্ঘ যাত্রা, ধীর গতি অন্যদিকে ভারতের নিজস্ব যুদ্ধবিমান প্রকল্প ‘লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট (LCA) তেজস’ শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত যুগের মিগ–২১ প্রতিস্থাপন করা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় লেগেছে তিন দশকেরও বেশি।
তেজস প্রথমবারের মতো ভারতীয় বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রনে যুক্ত হয় ২০১৬ সালে। বর্তমানে আনুমানিক ৪০টির মতো তেজস বিমান অপারেশনাল অবস্থায় রয়েছে। যদিও ভারত সরকার তেজসকে ‘স্বদেশি’ প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে, বাস্তবে এর ইঞ্জিন (GE F404/F414), রাডার ও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিদেশি উৎসনির্ভর। সম্প্রতি জিই ইঞ্জিন সরবরাহে বিলম্বের কারণে তেজস মার্ক–১এ উৎপাদন আরও ধীর হয়ে পড়ে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ভারতীয় বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন সংখ্যা প্রয়োজনীয় ৪২টির বিপরীতে বর্তমানে নেমে এসেছে প্রায় ৩১–৩২ এ।
কেন এগিয়ে গেল পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জেএফ-১৭ প্রকল্পে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন ছিল তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল দ্রুত। বিপরীতে, ভারতের তেজস প্রকল্পে بيرোক্র্যাটিক জটিলতা, প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বিদেশি সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা প্রকল্পের গতি কমিয়েছে। জেএফ-১৭ দ্রুত যুদ্ধ প্রস্তুত স্কোয়াড্রন গঠন করতে পারায় পাকিস্তান শুধু নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয়নি, বরং রপ্তানি বাজারেও প্রবেশ করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে এটি পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: কৌশলগত বাস্তবতা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বর্তমান বহরে এফ-৭ বিজিআই, মিগ–২৯ এবং কিছু প্রশিক্ষণ ও পরিবহন বিমান রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা ধরে রাখতে আগামী এক দশকে বাংলাদেশকে আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করতেই হবে।
এই প্রেক্ষাপটে জেএফ-১৭ তুলনামূলক কম খরচ, সহজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুত ডেলিভারির কারণে একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে আলোচনায় আসছে। তবে এখনো এটি আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। আঞ্চলিক প্রভাব বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি জেএফ-১৭ ক্রয়ের পথে এগোয়, তা কেবল একটি সামরিক ক্রয় নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্য ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেবে। একই সঙ্গে এটি ভারতের প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতা ও রপ্তানি উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলবে। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ–পাকিস্তান যুদ্ধবিমান আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে যে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা আগামী দিনে আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


