শিরোনাম
পাবলিক পরীক্ষার আইন পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন প্রমাণ করে পারমাণবিক অস্ত্র অপরিহার্য: উত্তর কোরিয়া মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা ‌‘চোখে আঙুল দিয়ে’ দেখিয়ে দিলো ইরান দিনাজপুরে প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন ঘিরে প্রস্তুতি সভা আমারপে-তে ১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ গ্লোবাল ফিনটেক কোম্পানি সিমপায়সার বিজয়পুর নোয়াপাড়ায় এতিম ছাত্রদের মাঝে নতুন পাঞ্জাবি বিতরণ, মুখে ফুটল আনন্দের হাসি ময়মনসিংহে সরকারি যাকাত ফান্ডের চেক বিতরণ করলেন জেলা প্রশাসক রংপুরে অকাল বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে আলুর ক্ষেত ক্ষতির আশঙ্কা, দুশ্চিন্তায় কৃষক ভালুকায় সার্ভেয়ার ও উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ সাবেক যুবলীগ নেতা কোটিপতি সেলিমের বদলী বাণিজ্য জমি দখলসহ যত অভিযোগ

মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা ‌‘চোখে আঙুল দিয়ে’ দেখিয়ে দিলো ইরান

Chif Editor

অনলাইন ডেস্কঃ    এখনই বলা ঠিক হবে না যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান থেমে গেছে বা খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হবে। পরিস্থিতি এখনও অস্থির এবং ইরান রাষ্ট্রের সহনশীলতা এখনো পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। তবে এই প্রাথমিক পর্যায়েই সংঘাতটি একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে—বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে, যখন বিশ্বে আধিপত্য পুনঃস্থাপনের তাদের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা শেষ হবে।

যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাবে—এমন ধারণা অবাস্তব। আমেরিকার পতনের কল্পনা মূলত কল্পনার জগতের বিষয়। রাশিয়া, চীন, ভারতসহ অন্যান্য বড় শক্তির কাছে আসল প্রশ্ন হলো: যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে থাকবে কি না, তা নয়; বরং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তারা কীভাবে নিজেদের স্থান করে নেবে।

রাশিয়ার জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ, যার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক সবসময়ই ঘনিষ্ঠ কিন্তু সংঘাতপূর্ণ ছিল। ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাসের কারণে রাশিয়ার কৌশলগত হিসাব-নিকাশে পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তাই রাশিয়াকে ভাবতে হবে ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্যে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় যাতে তা রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করে।

ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করতে পারে। এগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে, এমন এক বিশ্বে, যেখানে একতরফা নেতৃত্ব আর সহজে মেনে নেওয়া হয় না, সেখানে মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইরান কতদিন সামরিক চাপ সহ্য করতে পারবে, বাইরের সহযোগীরা কতটা সাহায্য করবে, কিংবা ওয়াশিংটন নিজেই কতদিন এই অভিযান চালিয়ে যেতে প্রস্তুত—এসব প্রশ্ন এখনও খোলা রয়েছে।

তবে ইতিমধ্যেই একটি দ্বৈত চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলের নেতৃত্ব মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সদস্যরা ইরান রাষ্ট্রের অপ্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত। একই সময়ে অনেক মার্কিন মিত্রও এই সংঘাতের পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।

এই অর্থনৈতিক চাপই ব্যাখ্যা করে কেন এমন গুজব ছড়াচ্ছে যে, ওয়াশিংটন হয়তো নীরবে এমন মধ্যস্থতাকারীদের খুঁজছে যারা তেহরানের সঙ্গে সংলাপ শুরু করতে পারে।

এই অস্থির পরিস্থিতিতে রাশিয়া ইরানের জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে, যাদের তারা উসকানিবিহীন হামলার শিকার হিসেবে দেখে। তবে একই সময়ে মস্কোকে এমন নীতি অনুসরণ করতে হবে যা তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বের বড় সামরিক শক্তিগুলোর একটি হিসেবে রাশিয়ার প্রধান উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তির সামগ্রিক ভারসাম্য এবং সেখানে ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অবস্থান।

এই অবস্থান বোঝাতে একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপমা ব্যবহার করা যায়। বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নিওপ্লাজম (অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা টিউমার)-এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো এখানে তা পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে না। বরং এটি সেই ব্যবস্থার বিকাশের অংশ হয়ে যায় এবং একটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অসাধারণ অবস্থান অর্জন করেছিল, তা শুধু তার শক্তির কারণে নয়। তখনকার বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিও এর কারণ ছিল। পশ্চিম ইউরোপ যুদ্ধবিধ্বস্ত ছিল, চীন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় ছিল, আর সোভিয়েত রাশিয়া তার কমিউনিস্ট পরীক্ষার সময় বিশ্ব থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্ব গ্রহণের সুযোগ দেয়।

তবে এই নেতৃত্ব রোমান সাম্রাজ্য বা চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যের মতো সামরিক বিজয়ের ফল ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র তার বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সিদ্ধান্তমূলক সামরিক পরাজয়ের মাধ্যমে হারায়নি। বরং অন্য শক্তিগুলো যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় ব্যস্ত ছিল, তখন সে সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হিসেবে উঠে আসে।

এই অর্থে বলা যায়—একটি কাফেলার “শেষ উট” হঠাৎ নেতৃত্বে চলে এসেছে, কারণ অন্যরা পিছিয়ে পড়েছিল।

আজ সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতি আর নেই। এখন আর কোনো বাস্তব কারণ নেই যে অন্য শক্তিগুলো পিছিয়ে থাকবে। ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতির একমাত্র আধিপত্যকারী শক্তি না হয়ে একটি স্বাভাবিক অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠতে পারে।

ইরান সংকট এই পরিবর্তনকে স্পষ্ট করে। বিশাল সম্পদ ও সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সহজে একটি বড় ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রকে দমন করতে পারে না—যদি না তা পারমাণবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা সব পক্ষের জন্যই অকল্পনীয়।

এই দিক থেকে ইরানে ট্রাম্পের অভিযান একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা হতে পারে। এটি দেখিয়ে দেয় যে আমেরিকার অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্যের যুগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অর্থহীন। এই শিক্ষা শুধু অন্য দেশের জন্য নয়, আমেরিকানদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ—যাদের একসময় তাদের শক্তির সীমা মেনে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।

রাশিয়া, যে তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে, এই সীমাগুলো ভালোভাবেই বোঝে। অধিকাংশ বড় শক্তিও তা বোঝে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই এখনও পুরোপুরি সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি।

তাই এখন যে কঠিন শিক্ষা তারা পাচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত উপকারীও হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে অতিরঞ্জিত ভয়ও এড়াতে হবে। আমেরিকার আধিপত্য কমে গেলে বিশ্বে অবশ্যই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে—এই ধারণা অনেকটা বর্তমান ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য ব্যবহৃত একটি বক্তব্য মাত্র। বাস্তবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্ভব এবং অনেক ক্ষেত্রে তা কাম্যও।

রাশিয়ার ইতিহাসও এই বিষয়টি দেখায়। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার পর থেকেই রাশিয়া অনেক সময় আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের পররাষ্ট্রনীতির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৮ ও ১৯ শতকে এই লক্ষ্য ছিল মূলত ব্রিটেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। পরে রাশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিভুজ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর গতিপথ নির্ধারণ করেছে।

আজ নতুন নতুন কাঠামো তৈরি হচ্ছে। ইউরোপ ও চীনের ওপর আমেরিকার চাপ অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গঠনে সাহায্য করতে পারে যেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর আধিপত্য করবে না।

এমন ফলাফল রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গেও বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বর্তমান অস্থিরতার সময় থেকে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, তা আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধ ও সংকট থাকতে পারে, কিন্তু তা মূল রূপান্তরকে আড়াল করা উচিত নয়।

যদি পৃথিবী এই পরিবর্তনের সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই পার হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে—কিন্তু তা এই কারণে নয় যে বিশ্ব আমেরিকার নেতৃত্বের প্রয়োজন অনুভব করে, বরং অন্যান্য শক্তি তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করেই চলবে।

সূত্র: আরটি

Leave a Reply