
অনলাইন ডেস্ক :- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে নতুন উপাদান হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। এর মাধ্যমে সহিংসতা, ঘৃণা ছড়ানো হয়; তা বন্ধ করার মতো কোনো উদ্যোগ বা ইচ্ছা নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারে নাই। এর অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য এই সরকার কিছু করতে পারছে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের সূচনায় জিল্লুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরপরই শুরু করেছি।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতা ও ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, অথচ তা প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা ইচ্ছা লক্ষ্য করা যায়নি। একইভাবে এই অপব্যবহার রোধে বর্তমান সরকারও উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ক্রমাগত দাবি জানানো হচ্ছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহারের ফলে কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেছে, তবে এটি টেকসই করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। এজন্য একটি একীভূত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে, যা নির্বাচন কমিশন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থেকে একটি স্বায়ত্তশাসিত, নজরদারিভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে নতুন সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্সকে আগামী সরকারকে বৈধতা দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো আগামী নির্বাচনে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে জনগণের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, দুর্নীতি ও ঘুষ থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর পথ হলো ডিজিটালাইজেশন। কারখানায় সিসিটিভি স্থাপনের ফলে স্বচ্ছতা ও নজরদারি বেড়েছে। আগে কারখানায় ঢোকার সময় সই করতে হতো, পরে পাঞ্চ কার্ড, আর এখন ডিজিটাল কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে—ফলে কাজ অনেক সহজ হয়েছে। প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কোনো মেশিন নষ্ট হলে এখন চীনা প্রস্তুতকারকের সঙ্গে ভিডিও কলে বসেই তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের কাজে লাগাতে হবে, কারণ ব্যয়বহুল বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সক্ষমতা অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, আমরা যতই অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশনের কথা বলি না কেন, মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনাও মূলত ব্যক্তিগত অসচেতনতার ফল। এনবিআর অটোমেশনের কাজ ভিয়েতনামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল, যারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা নিয়ে চলে গেছে—আমরা কিছুই করতে পারিনি। সুন্দরবনের বাঘকে যেমন ডিজিটাল হতে বলা যায় না, তেমনি মানসিকতা না বদলালে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা থাকে না।
তিনি বলেন, আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস কমিউনিকেশন পড়াই, কিন্তু শিক্ষার্থীরা যোগাযোগের মৌলিক বিষয়ই শিখতে চায় না। সেখানে শুধু ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করে লাভ হবে না। নীতিগতভাবে আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতি দরকার, যার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে। পাশের দেশগুলো থেকে লোকজন সিলিকন ভ্যালিতে শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করছে, অথচ আমরা পারছি না—কেন পারছি না, তা নিয়ে ভাবা জরুরি।
আসিফ ইব্রাহিম বলেন, যে তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নীতি প্রণয়ন করি, তার নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু—এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকেও আধুনিক করতে হবে। ই-কমার্স খাতে আমাদের অবস্থা এখনো সন্তোষজনক নয়। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ জরুরি। উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই।
এম এ বাকী খলীলী বলেন, নতুন সরকার যেন বিদ্যমান সুযোগগুলো গ্রহণ করে। প্রচলিত ধারা অনুসরণ না করে নতুনভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। অর্থনীতি সচল রাখতে ডিজিটালাইজেশন অপরিহার্য। উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের ফিনটেক আছে, তবে এডটেকের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল শিক্ষা কতটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেটি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। সাপ্লাই টু ফাইন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। দেশের তরুণদের কেন্দ্র করেই আমাদের ডিজিটাল গ্রোথ গড়ে তুলতে হবে।
সবুর খান বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হলো—আমরা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করছি না। আমার মনে হয়, আমরা ধীরে ধীরে একটি অসুস্থ জাতিতে পরিণত হচ্ছি। গণমাধ্যমের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য নেই। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। রাজনীতিবিদরা অনেক সময় অন্যের কথা শুনতে চান না। ২০০২ সালে কম্পিউটারের ওপর কর আরোপ করে একটি সম্ভাবনাময় খাতকে কার্যত গলা টিপে ধরা হয়েছিল। পরে দীর্ঘ চেষ্টার পর সেই কর প্রত্যাহার করা হয়। গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।



