অনলাইন ডেস্ক :- ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘পোস্টাল ব্যালট’। বিশেষ করে ব্যালট পেপারের নকশা এবং সেখানে বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিএনপির দাবি, এটি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) একে দেখছে কেবলই একটি ধারণাগত বিষয় ও ছাপাজনিত ‘মিস’ হিসেবে।
পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক: ধানের শীষের অবস্থান ও বিএনপির উদ্বেগ
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রবাসীদের জন্য বড় পরিসরে পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের যুক্তি ও ব্যাখ্যা
বিএনপির এই গুরুতর অভিযোগের পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ দু’দফায় ব্যাখ্যা দেন।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, এটি একটি ‘মিস’ বা অনিচ্ছাকৃত ভুল। ব্যালট পেপার ছাপানোর সময় একটি নির্দিষ্ট ক্রম বা গেজেটের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা হয়।
ইসি সচিব বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের ক্রম অনুযায়ী প্রতীকের তালিকা করা হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যালটের ডিজাইন করা হয়েছে। এখানে মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ কম ছিল।
পুনরায় ছাপানোর দাবি ও সীমাবদ্ধতা:
বিএনপি যে পোস্টাল ব্যালটগুলো পুনরায় ছাপানোর দাবি তুলেছে, সে বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, প্রবাসে যেসব ব্যালট ইতিমধ্যে বিদেশে পাঠানো হয়ে গেছে, সেগুলো পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। তবে দেশের অভ্যন্তরে যে পোস্টাল ব্যালটগুলো এখনো বিলি করা হয়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এ বিষয়ে বলেন, প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে নয়, কেবল দেশের ভেতরে যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, তাদেরটায় প্রতীকের পাশাপাশি প্রার্থীর নাম যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি:
বাহরাইনের ভিডিও প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কোনো ধরনের নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না। যদি কেউ কারচুপি করার চেষ্টা করে, তবে তার এনআইডি ব্লক করা হবে এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে ফিরিয়ে এনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন কেবল প্রতীক রাখা হলো পোস্টাল ব্যালটে:
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, পোস্ট অফিস আমাদেরকে বলেছে তাদের নূন্যতম যেগুলো ইজি ডেস্টিনেশন সেখানে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়ে ফেরত আনতে ১৬ দিন সময় লাগে। আর সবচেয়ে দুরের দেশে লাগবে ১৮ দিন। কাজেই প্রার্থী চুড়ান্ত হওয়ার আগেই যারা প্রবাস থেকে নিবন্ধন করবেন তাদের ব্যালট পাঠানো ছাড়া উপায় নেই। আর প্রার্থিতা চুড়ান্ত হওয়ার আগে ব্যালট পাঠালে কেবল প্রতীকই রাখতে হয়। এজন্যই প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে কেবল প্রতীক রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর নাম নেই।
কত জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবে, কোথায় কতজনের আবেদন
এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য প্রবাসীদের ছাড়াও দেশের সরকারি চাকরিজীবি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও কয়েদীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। গত ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল নিবন্ধনের সময়। এই সময়ের মধ্যে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এরমধ্যে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি চাকরিজীবী, কয়েদীরা দেশের ভেতর থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন। আর প্রবাস থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন ভোটার।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, নিবন্ধনকারী এসব ভোটারের ঠিকানায় ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠানো হচ্ছে। ভোটাররা ভোট দিয়ে ফিরতি খামে তা আবার ফেরত পাঠাবেন। আগামী ২১ থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে তারা ভোট দিতে পারবেন। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন করা হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৯৩ জন। সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে, ১ হাজার ৫৯৫ জন।
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন করেছেন কুমিল্লাবাসীরা, ১ লাখ ১২ হাজার ৯০ জন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা জেলায়, ১ লাখ ৮ হাজার ৭৫৫ জন, চট্টগ্রাম জেলায় ৯৫ হাজার ২৯৭ জন ও নোয়াখালী জেলায় ৬১ হাজার ২৫১ জন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বান্দরবানে, ৪ হাজার ৬৯৫ জন।
কিভাবে ভোট দেবে:
নির্বাচন কমিশনের পাঠানো খামে দুটো ব্যালট পেপার থাকবে। একটি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের, অন্যটি সংসদ নির্বাচনের। এক্ষেত্রে ভোটার ইসির পাঠানো খামটি পাওয়ার পর অপেক্ষা করবেন। যখন প্রার্থিতা চুড়ান্ত হয়ে যাবে, তখন তারা অ্যাপে প্রবেশ করে তার আসনের প্রার্থীদের দেখতে পারবেন। আর ভোটারের হাতে থাকা ব্যালটে কেবল প্রতীক থাকবে, কোনো নাম থাকবে না। অ্যাপে প্রার্থীর তালিকা দেখে ব্যালটে ভোট দিয়ে এবং গণভোট দিয়ে ফিরতি খামে ভরে নিকটস্থ পোস্ট অফিস বা পোস্টবক্সে ফেলে দিয়ে আসলেই তা সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে চলে আসবে। এরপর সেই ভোট নির্বাচনের দিন গণনা করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। কোনো ব্যালট পেপার নির্বাচনের পরে এসে পৌঁছালে তা গণনা করা হবে না।
আগামী ২৩ জানুয়ারি থেকে সাধারণ ব্যালট পেপার ছাপানো হবে। সে সময়ই দেশের অভ্যন্তরে ব্যালট পেপারও ছাপানো হবে। এক্ষেত্রে এদের ক্ষেত্রে ব্যালটে প্রতীকের পাশে থাকবে প্রার্থীর নামও।
সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের মতো। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। বর্তমানে চলছে প্রার্থিতা চুড়ান্তের কাজ। এবার ৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে। দলগুলো ২ হাজার ৯১টি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে এবং স্বতন্ত্র থেকে ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ হয়েছেন ১ হাজার ৮৪২ জন। আপিল নিষ্পত্তির পর এই সংখ্যা বাড়বে। যে সব দল প্রার্থী দেয়নি এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম।
প্রধান সম্পাদক : জুয়েল খন্দকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম রাশেদ হাসান
নির্বাহী সম্পাদক : গাজী ওয়ালিদ আশরাফ সামী
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হট-লাইন নাম্বার : ০১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ০১৯৬৭৯৯৯৭৬৬.
স্বত্ব © ২০২৬ দেশপত্র