প্রিন্ট এর তারিখঃ ফেব্রুয়ারী ২৫, ২০২৬, ৫:৪৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ২:৫০ পূর্বাহ্ণ
পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস আজ
অনলাইন ডেস্ক :- বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি-বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) বিদ্রোহ ও পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭তম বার্ষিকী আজ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি)। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআরের বিপথগামী সদস্যরা কতিপয় দাবিদাওয়ার নামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে পিলখানায় নারকীয় তাণ্ডব চালায়।
ওই দুই দিনে তারা বাহিনীর তখনকার মহাপরিচালকসহ (ডিজি) ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ছাড়াও নারী ও শিশুসহ আরও ১৭ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পর বাহিনীর নিজস্ব আইনে বিচার করে অনেককেই বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছাড়াও আরও ৪২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাই কোর্টে আপিলের রায়ে ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখা হয়। আটজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চারজনকে খালাস দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখা হয়।
হাই কোর্টে আপিল চলার সময়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়। খালাস পান ১২ জন আসামি। নিম্ন আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যে আপিল করেছিল, তাদের মধ্যে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাই কোর্ট। এ ছাড়া সাত বছর করে চারজনকে কারাদণ্ড এবং ৩৪ জনের খালাসের রায় বহাল রাখা হয়। এ মামলার সাড়ে ৮০০ আসামির মধ্যে আরও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন জজ আদালত।
তাদের মধ্যে ১৮২ জনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড, আটজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড, চারজনকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ২৯ জনকে খালাস দেন হাই কোর্ট। বিভাগীয় মামলায় চাকরিচ্যুতসহ সাজা দেওয়া হয় আরও অনেককে। ২০০৯ সালের নির্মম এ হত্যাযজ্ঞের পর পুরো বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তবে বাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কলঙ্কিত সেই ইতিহাস ও ক্ষত ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে এখনো। বিদ্রোহীদের হাতে নিহতদের স্মরণে প্রতি বছর ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর বিডিআর বিদ্রোহের প্রায় দেড় দশক পর অন্তর্র্বর্তী সরকার ঘটনার পুনঃতদন্ত শুরু করে। গঠন করা হয় জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন, যার লক্ষ্য পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করা। বিডিআর বিদ্রোহের নামে পিলখানায় সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
সেখানে কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা দাবি করেন, ইতিহাসের এই ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এই কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এই প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।
কমিশনের প্রধান ফজলুর রহমান ওই হত্যাযজ্ঞের মূল কারণ সম্পর্কে বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড হওয়ার অনেক কারণ আছে। এক হলো- বিডিআরের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। যেমন ডাল-ভাত কর্মসূচি একটা, তারপর বিডিআর শপ তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে বিডিআর সদস্যদের ডিউটি অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। এটা বিডিআরের ক্লাসিক্যাল বিষয়ের সঙ্গে যায় না।
কিছু বিডিআর সদস্য যেভাবেই প্রণোদিত হয়ে থাকুন, তারা সেনাবাহিনীর অফিসারদের এখানে চাচ্ছিলেন না। এটা একটা ছিল। আর বিডিআরের মধ্যে অনেক টানাপোড়েন ছিল, যেগুলো আমরা বের করতে সক্ষম হয়েছি। এ রকম অনেক কারণ ছিল এই হত্যাকাণ্ড সংঘটনে। এ ছাড়া ওই সময়ের সরকার তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল এবং প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল এবং সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে দুর্বল করতে চেয়েছিল।
কী ঘটেছিল সেদিন
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় পিলখানা সদর দপ্তরে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) দরবার হলে শুরু হয় বার্ষিক দরবার। বিডিআর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বক্তব্যের একপর্যায়ে বিডিআরের কিছু বিদ্রোহী সৈনিক অতর্কিত হামলা চালায় দরবার হলে। এরপর ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা।
বিডিআরের বিদ্রোহী সৈনিকরা উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা সেনা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে তাদের পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করেন। পুরো পিলখানায় এক বীভৎস ঘটনার সৃষ্টি হয়। নানা নাটকীয়তায় পিলখানার ভিতরের নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞ শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিদ্রোহের অবসান ঘটলে পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ।
২৭ ফেব্রুয়ারি পিলখানার ভিতরে সন্ধান মেলে একাধিক গণকবরের। সেখানে পাওয়া যায় তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, তাঁর স্ত্রীসহ সেনা কর্মকর্তাদের লাশ। এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়।
ঢাকা মহানগর তৃতীয় বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিডিআরের সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৭৭ জনকে খালাস দেওয়া হয়। সর্বশেষ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ২৫০ জন বিডিআর জওয়ানকে জামিন দেন আদালত। ২৩ জানুয়ারি ১৭৮ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আজকের কর্মসূচি
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শোকাবহ পিলখানা ট্র্যাজেডির এ দিনটিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শহীদ ব্যক্তিদের স্মরণে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) শাহাদাতবার্ষিকী পালন করবে বিজিবি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সকালে বনানীর সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বিকালে ক্যান্টনমেন্টে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : জুয়েল খন্দকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম রাশেদ হাসান
নির্বাহী সম্পাদক : গাজী ওয়ালিদ আশরাফ সামী
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হট-লাইন নাম্বার : ০১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ০১৯৬৭৯৯৯৭৬৬.
স্বত্ব © ২০২৬ দেশপত্র