
অনলাইন ডেস্ক :- মানবিকতা আর নেতৃত্বের মেলবন্ধনে যে নামটি স্বতন্ত্র, তিনি তারেক রহমান। তাঁর আচরণ, কাজ আর মনের গভীর ভালোবাসা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করছে, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা। কঠিন সময়ে দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মানবতার নতুন এক অধ্যায় রচনা করছে।
তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জ্যৈষ্ঠ সন্তান। তিনি ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।
ইতিপূর্বে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের একজন সাক্ষী ও অংশগ্রহণকারী। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা-মা ও ভাইসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য গ্রেপ্তার হওয়া সর্বকনিষ্ঠ কারাবন্দীদের একজন।
৯০-এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজপথে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৮৮ সালে দলের গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি তৃণমূল থেকে জনগণকে সংগঠিত করেছিলেন এবং এইচ এম এরশাদ সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার মায়ের সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন।
বগুড়ায় তৃণমূল থেকে নেতা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিলেন তারেক রহমান। ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা ইউনিটে তিনি একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন যেখানে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। বগুড়ায় সফল সম্মেলনের পর তিনি অন্যান্য জেলা ইউনিটকেও গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচন করতে উৎসাহিত করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা ও সুশাসনের ওপর গবেষণা করার জন্য ঢাকায় একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের সদস্যদের সঙ্গেও তিনি আলোচনা করেন। তার প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। চেয়ারপারসনের ছেলে হয়েও এবং তৃণমূল থেকে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও তিনি স্বজনপ্রীতি করে কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ না করে দলের তৃণমূলের ক্ষমতায়নে মনোনিবেশ করেন।
২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সামরিক শাসকদের বেআইনি ক্ষমতা দখলের পর একই বছরের ৭ মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টস্থ মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তার ওপর ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। প্রায় আঠারো মাস কারান্তরীণ থাকার পর ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ তারিখে সবগুলো মামলায় তারেক রহমান জামিন লাভ করেন ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি লাভ করেন। সেদিন রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমান সংগঠনের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। উক্ত কাউন্সিলে তারেক রহমানের একটি ধারণকৃত বক্তব্য উপস্থিত জনসমাবেশের উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়। বক্তব্যটিতে তারেক রহমান জানুয়ারি ২০০৭-এ ক্ষমতায় আসা অগণতান্ত্রিক সরকারের হাতে তার অন্যায় গ্রেপ্তার ও বন্দি অবস্থায় নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হওয়া বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার আড়ালে তাকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।
২০০৭ সালের পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তার বিরুদ্ধে ৮৪টি মিথ্যা মামলা করা হয় এবং কয়েকটি মামলায় একতরফা রায় ঘোষণা করে তাকে সাজা দেয়া হয়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালত তাকে দণ্ডপ্রাপ্ত সকল অভিযোগ থেকে খালাস দেয় এবং তার সাজা বাতিল করা হয়।
তারেক রহমান একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হতে যাচ্ছেন। একটি কল্যাণমূলক জনবান্ধব রাষ্ট্রগঠনের পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই তিনি জাতির সামনে বিভিন্ন পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ৩১ দফা ঘোষণার মাধ্যমে।
স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, প্রযুক্তিসহ নানা খাতের উন্নয়নের জন্য তিনি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যেতে পারলে। তিনি ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড, হেলথ কার্ড কর্মসূচি শুরু করার কথা বলেছেন। দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য শিক্ষা খাতকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খোলার উদ্যোগ তিনি নেবেন।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিএনপি কয়েক দফা ভাঙনের মুখে পড়েছিল। সেবার তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতির মাঠে নেমে শক্ত হাতে বিএনপিকে পতনের মুখ থেকে তুলে আনেন। এবার তারেক রহমানের কৌশলী রাজনীতির কারণে বিএনপি রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তভাবেই ধরে রেখেছে। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনীতির মধ্যে এক অদ্ভুত মিল আছে। তিনজনই দেশের চরম ক্রান্তিকালে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এবার আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিদেশে বসে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। তবে এবারের আন্দোলনের প্রকৃতি ছিল ভিন্ন। প্রথম তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। আর ভয়ংকর ফ্যাসিবাদের কারণে একক ব্যক্তি বা দলের পক্ষে আন্দোলনকে সুসংগঠিত করা কঠিন ছিল; বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে তারেক রহমান শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মারা যান। দলীয় প্রধানের পদটি শুন্য হলে ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান ১৯৯৪ সালে সাবেক নৌবাহিনী প্রধান এবং দুই বারের মন্ত্রী প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা ডাঃ জোবায়দা রহমানকে বিয়ে করেন। জোবায়দা রহমান একজন কার্ডিওলজিস্ট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন। তাদের একমাত্র সন্তানের নাম জাইমা রহমান। জাইমা রহমান কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনে স্নাতক এবং পরবর্তীতে লিঙ্কন’স ইন থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন।
গুরুত্ব ও প্রভাব বিবেচনায় তারেক রহমানের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উক্তি:
* রাজনীতি মানে জনগণের সেবা ব্যক্তিগত লাভ নয়! নীতি আদর্শকে আঁকড়ে ধরে মানুষের জন্য কাজ করাই একজন নেতার প্রধান দায়িত্ব!
* কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
* সত্য, ন্যায়, সাহসের পথে চললেই জাতি উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে আর মিথ্যা কখনো কোনোদিন টিকে থাকতে পারে না!
* গণতন্ত্র মানে শুধুমাত্র নির্বাচন নয়, গণতন্ত্র মানে মানুষের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
* সকল ধর্মের মর্মবাণী হচ্ছে দেশপ্রেম, শান্তি ও মানব কল্যাণ।
* বাংলাদেশের জনগণ আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা আমার প্রধান লক্ষ্য।
* যুবসমাজ দেশের চালিকা শক্তি! তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে বাংলাদেশ উন্নত আর সমৃদ্ধ বা মর্যাদাবান রাষ্ট্রে পরিণত হবে!
* শক্তি কিংবা ভয় দেখিয়ে নয়, ইনসাফ এবং উদারতা দিয়ে মানুষের মন জয় করুন।
* আমরা এক নতুন যাত্রায় আছি, যেখানে কেউ নিপীড়িত হবেন না।
* বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সবাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বার্থে কাজ করবে!
* ত্যাগ আর সততা ছাড়া প্রকৃত নেতৃত্ব কখনো গড়ে ওঠে না! জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সেবা আর ত্যাগ অপরিহার্য বিষয়!
* কথা বলার রাজনীতি নয়, জনগণের মানোন্নয়নের রাজনীতি করতে হবে।
* গণতন্ত্রের ধারা বহমান রাখতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে।
* যোগ্য নেতৃত্বই পারে দেশ গড়তে।
* নারীসমাজ যাতে বঞ্চিত না হয়, সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
* বিএনপি আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজিয়ে তুলতে কাজ করছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক



