প্রিন্ট এর তারিখঃ জানুয়ারী ২২, ২০২৬, ৯:৫৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারি ২২, ২০২৬, ৬:০৪ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক লড়াইয়ের নতুন ময়দান হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মাঠপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে। তবে বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলো কয়েক মাস ধরেই অনলাইনে তীব্র প্রচারযুদ্ধে লিপ্ত—বিশেষ করে টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে, যেখানে কোটি কোটি বাংলাদেশি ভোটার সক্রিয়।
দ্রুত তালে ছন্দময় একটি গান—যার কথা শুনলে গ্রামীণ জীবনের গল্প মনে হতে পারে—সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। “নৌকা, ধানের শীষ আর লাঙলের দিন শেষ; দাঁড়িপাল্লাই গড়বে বাংলাদেশ”—এমন কথায় লেখা গানটি বাস্তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে তৈরি একটি রাজনৈতিক প্রচারণা। চলতি বছরের নভেম্বরের শুরুতে গানটি ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে ভাইরাল হয়।
গানটিতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতীককে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানানো হয়েছে। নৌকা প্রতীক আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল), যে দলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। ধানের শীষ বিএনপির প্রতীক এবং লাঙল প্রতীক জাতীয় পার্টির—যে দলটি আশির দশকে সামরিক শাসক এরশাদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একসময় আওয়ামী লীগের মিত্র ছিল।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক হলো দাঁড়িপাল্লা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন মূলত বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রচারণা শুরু হলেও অনলাইনে এই লড়াই চলছে অনেক আগে থেকেই—বিশেষ করে জেন জি ভোটারদের মন জয় করতে, যারা ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং এবারও সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।
জামায়াতপন্থী গানটির জনপ্রিয়তা অন্য দলগুলোকেও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারমূলক গান তৈরিতে উৎসাহিত করে। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় বড় সমাবেশই আর একমাত্র উপায় নয়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন সমান শক্তিশালী হাতিয়ার।
লন্ডনপ্রবাসী নির্মাতা ও সংগীতশিল্পী হাল বান্না গানটি রচনা ও গেয়েছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, গানটি শুরুতে ঢাকার একজন প্রার্থীর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ যখন এটি শেয়ার করতে শুরু করল, তখন অন্য প্রার্থীরাও বুঝতে পারল এটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছে।’
এরপর বিএনপিও তাদের নিজস্ব প্রচারণামূলক গান প্রকাশ করে। গানটির কথায় বলা হয়—দলটি নিজের আগে দেশকে অগ্রাধিকার দেয়। “আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ; ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ”—এমন কথায় লেখা গানটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ জনমত জরিপে বিএনপি জামায়াতের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে।
২০২৪ সালের সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিও (এনসিপি) নিজস্ব গান প্রকাশ করে, যা অনলাইনে ভাইরাল হয়।
তবে সংগীতই নয়—ডিজিটাল প্রচারণার অংশ হিসেবে ছোট নাট্যধর্মী ভিডিও, আবেগী ভোটার সাক্ষাৎকার, নীতিনির্ধারণী ব্যাখ্যা, ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এবারের অনলাইন লড়াই শুধু সংসদ নির্বাচন ঘিরেই নয়।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা একই সঙ্গে একটি গণভোটেও অংশ নেবেন—‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজ, যা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আনা পরিবর্তনগুলোকে সাংবিধানিকভাবে স্থায়ী করার লক্ষ্যে তৈরি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস মনে করেন, গণভোটের মাধ্যমে এটি অনুমোদন জরুরি।
কেন অনলাইন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ।
ডেটারিপোর্টাল নামের একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের শেষদিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়—বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী, প্রায় ৫ কোটি ইউটিউব ব্যবহারকারী, ৯.১৫ মিলিয়ন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী ৫ কোটি ৬০ লাখের বেশি টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছে। অন্যদিকে এক্স (সাবেক টুইটার)-এর ব্যবহারকারী মাত্র ১৭.৯ লাখ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল ডিজিটাল উপস্থিতিই রাজনৈতিক দলগুলোকে অনলাইনে বিপুল বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের ৪৩.৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। এদের অনেকেই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন বা এমন তরুণ, যারা শেখ হাসিনার আমলে ভোটাধিকার থেকে কার্যত বঞ্চিত ছিলেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম, বিরোধী দমন-পীড়ন ও বর্জনের অভিযোগ ছিল, যা তরুণদের মধ্যে হতাশা নয়—বরং এবার ভোট দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প তৈরি করেছে।
ডিজিটাল কৌশল
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ফলে তারা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এতে নির্বাচন কার্যত দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
একদিকে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট, যারা নিজেদের আওয়ামী লীগের শাসনামলের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গুম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬ মেয়াদে দেশ শাসন করেছে।
অন্যদিকে রয়েছে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট, যেখানে এনসিপিও অন্তর্ভুক্ত।
বিএনপি নেতা মাহদি আমিন আল জাজিরাকে বলেন, দলটি অনলাইনে নীতিগত প্রস্তাব ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং ভোটারদের মতামত সংগ্রহ করছে। তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি একটি পরীক্ষিত শাসক দল। প্রতিটি খাতে আমাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।’
অনলাইন সম্পৃক্ততা বাড়াতে বিএনপি চালু করেছে MatchMyPolicy.com নামের একটি ওয়েবসাইট, যেখানে ভোটাররা দলের প্রস্তাবিত নীতির পক্ষে বা বিপক্ষে মত জানাতে পারেন।
জামায়াতে ইসলামীরও রয়েছে janatarishtehar.org নামের একটি ওয়েবসাইট, যার মাধ্যমে ভোটারদের মতামত নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জামায়াত নেতা জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আমরা আমাদের বিশ্বাসের কথাই তুলে ধরছি। অন্যদের অনুসরণ করি না। আমাদের প্রতিযোগিতা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক।’
অনলাইন লড়াইয়ে কে এগিয়ে?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখনই কাউকে বিজয়ী বলা কঠিন।
ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক মুবাশশির হাসান বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ছোট ভিডিও ও গ্রাফিক্সে তুলে ধরছে। যেমন—‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ৫০ লাখ নারী ও পরিবারকে মাসে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। ‘ফার্মার কার্ড’ পরিকল্পনায় কৃষকদের জন্য সার, বীজ, কীটনাশকের ন্যায্যমূল্য, সহজ ঋণ ও বীমার কথা বলা হচ্ছে।
ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্টের সম্পাদক কাদের উদ্দিন শিশির বলেন, জামায়াতঘনিষ্ঠ প্রচারণায় ভারতবিরোধী বার্তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাকে ফেরত পাঠাতে ভারত অস্বীকৃতি জানানোয় বিষয়টি তরুণদের মধ্যেও আলোচনায় এসেছে।
গণভোটও ভাইরাল
অনলাইন লড়াই শুধু দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটেও ডিজিটাল প্রচারণা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘প্রথাগত গণমাধ্যমের প্রভাব কমছে। তাই অনলাইন প্রচারণা অপরিহার্য।’
জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন কারচুপি ঠেকানো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি রোধে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।
এনসিপিও অনলাইনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ের প্রচারণার গুরুত্ব এখনো অপরিসীম। তবে হাল বান্নার ভাষায়, ‘অনলাইন প্রচারণা মানুষের আলোচনার বিষয় ঠিক করে দেয়।’ তরুণ ভোটারের দেশে সেটিই জয়-পরাজয়ের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
প্রধান সম্পাদক : জুয়েল খন্দকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম রাশেদ হাসান
নির্বাহী সম্পাদক : গাজী ওয়ালিদ আশরাফ সামী
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হট-লাইন নাম্বার : ০১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ০১৯৬৭৯৯৯৭৬৬.
স্বত্ব © ২০২৬ দেশপত্র