ফরিদপুরে দুই নারী প্রার্থী বিজয়ী

Chif Editor

অনলাইন ডেস্কঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুরের রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত মিলেছে কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের রায়ে। জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন নারী। শেষ পর্যন্ত বিজয়ের হাসি ফুটেছে দুই নারী প্রার্থীর মুখে।

তারা হলেন— শামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-২) এবং চৌধুরী নায়াব আহমেদ ইউসুফ (ফরিদপুর-৩)।
এলাকাবাসীর মতে, এটি কেবল দুটি আসনের ফল নয়; বরং উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক শক্তি, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনআস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। এ নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে—রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পথ দেখাতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত জয় নির্ধারণ করে জনগণের বিশ্বাস ও মাঠপর্যায়ের সংযোগ।

ফরিদপুর-২ : ঐতিহ্যের উত্তরসূরি থেকে জননেত্রী

সালথা-নগরকান্দা আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১,২১,৬৯৪ ভোট পেয়ে ৩২ হাজারের বেশি ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম (রিংকু)।

রাজনৈতিকভাবে এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এমন প্রেক্ষাপটে তার জয়কে অনেকেই সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার সফল প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন। প্রয়াত ওবায়দুর রহমান-এর কন্যা হিসেবে শামার পরিচয় দীর্ঘদিনের। তবে এবারের নির্বাচনে তিনি বারবার বলেছেন—তিনি উত্তরাধিকারকে সুবিধা নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।

একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এই বিজয় উল্লাসের নয়, দায়িত্বের। সালথা-নগরকান্দার মানুষ দীর্ঘদিন অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় পিছিয়ে। সংসদে গিয়ে প্রথম কাজ হবে এ অঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা।”

ফরিদপুর-৩ : পুনরুদ্ধারের রাজনীতি ও নগর ভাবনা

ফরিদপুর সদর আসনে ১,৪৮,৫৪৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন চৌধুরী নায়াব ইউসুফ।

এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার বিজয়কে অনেকেই আস্থা পুনরুদ্ধারের বার্তা হিসেবে দেখছেন। তিনি সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ-এর কন্যা। তবে নিজস্ব সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও মহিলা দলে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি আলাদা পরিচিতিও গড়ে তুলেছেন।

নায়াব ইউসুফ বলেন, “ফরিদপুর শহরকে আধুনিক ও নিরাপদ নগরীতে রূপ দিতে চাই। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত পরিবেশ গড়াই আমার অগ্রাধিকার।”

তিনি আরও বলেন, “মানুষ শুধু অতীত স্মৃতি দিয়ে ভোট দেয় না; তারা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। আমি সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব নিতে চাই।”

নারী নেতৃত্ব : প্রতীক নাকি বাস্তব শক্তি?

চারটি আসনে তিন নারী প্রার্থী অংশ নিলেও দুইজনের বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে নারীর অবস্থানকে দৃশ্যমান করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমি সামাজিক স্বীকৃতি এনে দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্ধারক ছিল মাঠপর্যায়ের সংযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনসম্পৃক্ততা।

দুই নেত্রীর বক্তব্যে একটি মিল স্পষ্ট—তারা রাজনীতিকে ‘ক্ষমতার প্রতিযোগিতা’ নয়, বরং ‘দায়িত্বের ক্ষেত্র’ হিসেবে তুলে ধরছেন।

শামা ওবায়েদ যেখানে গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর জোর দিচ্ছেন, সেখানে নায়াব ইউসুফ শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা ও নগর নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। অগ্রাধিকার ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক—জনআস্থা ধরে রাখা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

ফরিদপুরের চার আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি এবং একটিতে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক ফলাফলের বাইরেও এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে নারী নেতৃত্বের দৃশ্যমান উত্থান।

একসময় যেখানে নারী প্রার্থিতা ছিল ব্যতিক্রম, এখন সেখানে নারী নেতৃত্ব নির্বাচনী সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে—এ ফলাফল সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনে জয় যেমন রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেয়, তেমনি বাড়িয়ে দেয় প্রত্যাশা। শামা ও নায়াব—দুজনের কাছেই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা এবং দলমত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

ফরিদপুরের মানুষ যে আস্থা তাদের ওপর রেখেছেন, তা কতটা দৃশ্যমান পরিবর্তনে রূপ নেয়—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply