যেসব কারণে বিএনপির ভূমিধস বিজয়

Chif Editor

অনলাইন ডেস্ক :- দীর্ঘ ১৭ বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি এক অভাবনীয় ভোট উৎসবে মেতে উঠেছিল গোটা বাংলাদেশ। রাজপথে প্রচার-প্রচারণা, নির্বাচনী আমেজ আর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কথার লড়াইয়ের তীব্র উত্তেজনা থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। অতীতের সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে এক ধরনের রাজনৈতিক সহঅবস্থানের চিত্র প্রত্যক্ষ করেছে গোটা দেশ। এই নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থীরা।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে মোট ৪বার দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই দলটির এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করাকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিএনপির এই অভাবনীয় ভূমিধস বিজয়ের পেছনে কাজ করেছে বহুমুখী সমীকরণ। বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অত্যন্ত কৌশলী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ, তার সহনশীল আচরণ এবং নমনীয় ও সময়োপযোগী বক্তব্য সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে সঠিক সময়ে তার দেশে ফিরে আসা এবং দেশে ফিরেই দলের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা দমনে কঠোর হওয়া, বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বুঝিয়ে শুনিয়ে বসিয়ে দেওয়া এবং তাদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এর পাশাপাশি গত দেড় দশকে দলের অনেক যোগ্য ও ত্যাগী নেতার সীমাহীন আত্মত্যাগ এবং কারাবরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি এক গভীর সহমর্মিতা তৈরি করেছে। সর্বোপরি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সৃষ্ট দেশব্যাপী আবেগের এক বিশাল ঢেউ ব্যালট বাক্সে বিএনপির পক্ষে আছড়ে পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে এই বিশাল জয়ের সমান্তরালে নতুন সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পাহাড়সম ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও দেখছেন অভিজ্ঞ মহল। বিএনপির এই বিশাল বিজয়ের প্রধান কারিগর হিসেবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের গুণাবলিকে শীর্ষে রাখছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।
তাদের মতে, বিগত কয়েক বছরে তারেক রহমান তার রাজনৈতিক ইমেজে যে আমূল পরিবর্তন এনেছেন, তা সাধারণ ভোটারদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে তার বক্তব্যে প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতা এবং প্রতিপক্ষের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করার যে সংস্কৃতি তিনি শুরু করেছেন, তা দেশের তরুণ প্রজন্ম ও সুশীল সমাজের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।তারেক রহমানের সময়োচিত দেশে প্রত্যাবর্তন এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করার ফলে দলটির সাংগঠনিক শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলেছেন এবং যোগ্যদের মূল্যায়ন করেছেন, তা দলের ভেতরকার দীর্ঘদিনের কোন্দল নিরসনে জাদুর মতো কাজ করেছে। তারেক রহমানের এই পরিপক্ক ও নমনীয় নেতৃত্বই মূলত বিএনপিকে একটি আধুনিক ও জনমুখী দল হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী ফলাফলে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই ভূমিধস বিজয়ের পেছনে শুধু দলীয় জনপ্রিয়তা নয়, বরং একাধিক সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির এই সাড়ম্বরে প্রত্যাবর্তনকে একটি ‘ঐতিহাসিক বাঁকবদল’ হিসেবে দেখছেন তারা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অনুপস্থিতি এবং দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে সাধারণ ভোটারদের সামনে মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিই ছিল একমাত্র ‘নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য’ বিকল্প।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থার জরিপেও বিএনপির এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হওয়া লক্ষাধিক নেতাকর্মীর ত্যাগ এবং জিয়া পরিবারের প্রতি সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা ভোটকেন্দ্রে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোটার বা ‘জেন-জি’ ভোটারদের বড় একটি অংশ বিএনপির আধুনিক ও সংস্কারমুখী ইশতেহারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিএনপির এই বিশাল জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও কৌশলী নেতৃত্বকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। ১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় হওয়া এবং নির্বাচনের আগে তার ‘ভিন্নধর্মী’ গণসংযোগ সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল, যাকে অনেকে ‘তারেক বসন্ত’ হিসেবে অভিহিত করছেন। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসে থেকেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং তৃণমূলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা তারেক রহমানের নেতৃত্বের বড় সাফল্য। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে কঠোর অবস্থান নেওয়া বিএনপির জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি তারেক রহমান দিয়েছেন, তা গ্রাম ও শহর- দুই অঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তারেক রহমানের পরিমিত শব্দচয়ন ও প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীল আচরণ সাধারণ ভোটারদের মনে বিএনপির পুরনো ভাবমূর্তি বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটের মেরুকরণ। ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু সম্প্রদায় আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত হলেও এবার তাদের ভোটের একটি বড় অংশ বিএনপির বাক্সে জমা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত কয়েক বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া বিভিন্ন হামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতা এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দেওয়া নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।

অনেক সংখ্যালঘু ভোটার মনে করেছেন, জামায়াতে ইসলামীর মতো শক্তিশালি ডানপন্থি শক্তির উত্থান ঠেকাতে তুলনামূলক উদার ও জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে বিএনপিকে ভোট দেওয়াই হবে কৌশলগতভাবে সঠিক। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের একটি বড় অংশ তাদের দলের অনুপস্থিতিতে জামায়াতকে ভোট না দিয়ে বরং প্রশাসনিক হয়রানি থেকে বাঁচতে বা ‘শান্তি’ বজায় রাখতে বিএনপি প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে। এই ‘কৌশলগত ভোট’ বা ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ বিএনপির আসন সংখ্যাকে ২০০-এর উপরে নিয়ে যেতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

বিপুল বিজয়ের খবরে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা উল্লাসে মাতলেও দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে এক ধরনের পরিমিতি ও সতর্কবার্তা লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই ফলাফলকে ‘আনন্দময় ও বিষাদময়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই অভূতপূর্ব বিজয় দেখে যেতে পারলেন না, যা দলের জন্য এক বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি।

তবে তিনি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দলীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিপুল এই ম্যান্ডেট পাওয়ার পর নেতাদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের ঔদ্ধত্য তৈরি না হয়, সে বিষয়ে হাইকমান্ড অত্যন্ত সচেতন। অতীতে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর অনেক দলই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার নজির রেখেছে, যা বিএনপি এবার এড়াতে চায়।

তবে বিএনপির এই ভূমিধস বিজয়ের আনন্দ ম্লান করে দিতে পারে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে যে অবস্থায় রেখে গেছে, তাকে বিশ্লেষকরা ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। দেশের প্রায় প্রতিটি খাত এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। গত দেড় দশকে বিশাল অংকের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও তারল্য সংকটে ধুঁকছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য।

নতুন সরকারের জন্য পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা এবং ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ী সমাজও বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে এবং উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিএনপি যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, তবে এই বিপুল জনসমর্থন হতাশায় রূপ নিতে দেরি হবে না।

নির্বাচনে দলের অভাবনীয় সাফল্যের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, এই বিজয় মূলত গত ১৭ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এই ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে তারা গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকারের জন্য কতটা তৃষ্ণার্ত ছিল। আমাদের ওপর জনগণের এই আস্থা একটি বিশাল আমানত, যা রক্ষা করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। আমরা জানি আওয়ামী লীগ দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত ও বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা এবং তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। আমরা কোনো ধরনের প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না, বরং সবাইকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন করতে চাই। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকলেও আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তি যে কতটা মজবুত, এই নির্বাচন তা বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হবে ভেঙে পড়া পুলিশ প্রশাসনকে পুনরায় পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা।’

গত ১৮ মাস ধরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অস্থিরতার কারণে পুলিশের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যা সংস্কার করা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নানা দাবি-দাওয়া, রাজপথে আন্দোলন এবং ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দমনে পুলিশ এখনো আগের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সব সেক্টরে গেড়ে বসা দুর্নীতি এবং দলীয়করণের ফলে আমলাতন্ত্রেও স্থবিরতা বিরাজ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি অবিলম্বে পূর্ণ শক্তিতে কাজ শুরু করতে না পারে, তবে দেশে অরাজকতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশ ও প্রশাসনকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলা হবে বিএনপির জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে প্রথমেই জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যা বর্তমান ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে অত্যন্ত দুরূহ।

দেশের শিক্ষাখাত বর্তমানে এক বেহাল অবস্থায় রয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য সামনের দিনগুলোতে বড় মাথাব্যথার কারণ হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষা ক্যালেন্ডার পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এছাড়া প্রতিটি প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতির শিকড় এত গভীরে যে, তা উপড়ে ফেলা সহজ কাজ নয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কারের কাজ শুরু করলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখন বিএনপির নির্বাচিত সরকারের ওপর বর্তাবে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা যায়, তবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই সরকারও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অনেক সময় গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, ভোটে জেতা মানেই যা ইচ্ছা তাই করার ম্যান্ডেট পাওয়া নয়, বরং এটি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের একটি বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগও একইভাবে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল, যা পরবর্তীকালে তাদের একটি কর্তৃত্ববাদী ও দানবীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে সাহায্য করেছিল। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বিএনপি যদি তাদের এই বিশাল আসন সংখ্যাকে ‘একচ্ছত্র ক্ষমতার লাইসেন্স’ হিসেবে ধরে নেয়, তবে দেশের গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আবারও ব্যাহত হতে পারে। বিরোধী দলের শক্তিশালী উপস্থিতি ছাড়া একটি কার্যকর সংসদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বিএনপিকে এখন এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যেখানে ক্ষুদ্রতম রাজনৈতিক দলের কণ্ঠস্বরও শোনা যায় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পূর্ণভাবে নিশ্চিত থাকে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র মেরামতের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, বিএনপি সেই প্রত্যাশার চাপ কতটা সামলাতে পারবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। মানুষ এখন আর শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চায় না, তারা চায় ব্যবস্থার পরিবর্তন; যেখানে গুম, খুন, বিচারহীনতা ও দুর্নীতির কোনো স্থান থাকবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা এবং সরকার গঠনের প্রস্তুতির এই মাহেন্দ্রক্ষণে বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, তাদের লড়াই এখন আর প্রতিপক্ষ দলের সঙ্গে নয়, বরং নিজেদের ইমেজ ও জনগণের আস্থার সঙ্গে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপিকে বিগত আওয়ামী শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যাশা পূরণের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। একটি বহুত্ববাদী ও বৈচিত্র্যময় সমাজ বিনির্মাণ এবং শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম গড়ে তুলতে সাহায্য করা হবে বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়ার চাবিকাঠি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি যত বড়, সেই শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংযম ও ধৈর্যও তত বেশি প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বাংলানিউজকে বলেন, “যখন কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘উইনার টেকস অল’ বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মানসিকতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিএনপির এই ভূমিধস বিজয় যেমন তাদের জনপ্রিয়তার প্রমাণ, তেমনই এটি তাদের জন্য একটি বিশাল অগ্নিপরীক্ষাও বটে। অতীতে আমরা দেখেছি, যখনই কোনো দল এত বিশাল ম্যান্ডেট পায়, তখন তারা অনেক সময় সংসদকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদে রূপ নিতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে; বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে লুটপাট, সীমাহীন দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাওয়া নতুন সরকারের জন্য বড় বিষফোঁড়া। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের পর তরুণ প্রজন্মের যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা যদি দ্রুত পূরণ করা না যায়, তবে এই জনসমর্থন খুব দ্রুত ক্ষোভে পরিণত হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া পাচারকৃত অর্থের ক্ষত এবং ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে বিএনপিকে শাসনতান্ত্রিকভাবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তাই তাদের মনে রাখতে হবে, এবারের বিজয় কোনো উৎসবের সুযোগ নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের এক কঠিন দায়িত্ব।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির এই ভূমিধস বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তবে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা কোনো সহজ কাজ নয়। একদিকে মৃতপ্রায় অর্থনীতি ও ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত, অন্যদিকে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা, সব মিলিয়ে এক কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হবে নতুন সরকারকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি যদি তার ইশতেহার অনুযায়ী সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারে, তবেই এই বিজয়ের সার্থকতা বজায় থাকবে। অন্যথায়, বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঔদ্ধত্য যদি দলটিকে আবারও পুরনো পথে ধাবিত করে, তবে তা শুধু বিএনপির জন্যই নয়, গোটা দেশের গণতন্ত্রের জন্যই এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই বিএনপির জন্য এখন সময় হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

Leave a Reply