শিল্পী আক্তার, রংপুর ব্যুরো :- অন্যান্য অনেক জেলার তুলনায় রংপুরে বিএনপির তৃণমূল রাজনীতি এখনো উচ্ছৃঙ্খলতার অভিযোগে বড় কোনো ইমেজ সংকটে পড়েনি। বরং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ঐক্য ও সাংগঠনিক তৎপরতা চোখে পড়ছে। বিশেষ করে রংপুর সদর-৩ আসন ঘিরে মাঠে নেমে দলটি নির্বাচনমুখী কার্যক্রম জোরদার করেছে।
জাপার দুর্গে ফাটল ধরাচ্ছে বিএনপি-
১৯৮৬ সাল থেকে রংপুর সদর-৩ আসনটি জাতীয় পার্টির (জাপা) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের কারণে এই আসনে জাপার প্রভাব দীর্ঘদিন অটুট ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সেই চেনা সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। মাঠপর্যায়ে ঘুরে ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু জাপার সেই দীর্ঘদিনের আধিপত্যে দৃশ্যমান ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
স্থানীয়দের মতে, বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা এবার ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছেন এবং দলীয় বিভাজন তুলনামূলকভাবে কম। এতে ভোটের মাঠে বিএনপির অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্ত হয়েছে।
দাড়িপাল্লার প্রতীক ও সহানুভূতির রাজনীতি
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক দাড়িপাল্লা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান বেলাল। তিনি এলাকায় একজন পরিচিত ও ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় মানুষ হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন থেকে দূরে থাকা জামায়াতে ইসলামীর প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি ভোটারদের মধ্যে কাজ করছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটিকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে দীর্ঘদিন নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার বিষয়টি এখন জনমনে আলোচনার বাইরে নয়। এর ফলে দাড়িপাল্লা প্রতীকের প্রতি একটি নীরব সহানুভূতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জিএম কাদেরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
সব মিলিয়ে রংপুর-৩ আসনে এবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ দেশের বিভিন্ন স্থানে উন্নয়নের কিছু দৃষ্টান্ত রাখলেও রংপুরের জন্য প্রত্যাশিত ভূমিকা তেমন রাখতে পারেননি। তবুও ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও আবেগের কারণে রংপুরবাসীর মধ্যে এরশাদের প্রতি একধরনের উন্মাদনা ছিল।
তার মৃত্যুর পর সেই আবেগী আস্থার জায়গাটি পূরণ করতে পারেননি জিএম কাদের—এমন অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে আসছে। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের আগের তুলনায় বর্তমানে দলটির সাংগঠনিক ভিত দুর্বল হয়েছে বলেও মত দিচ্ছেন অনেক তৃণমূল নেতা।
তৃণমূলে ভাঙন ও নিষ্ক্রিয়তা
স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে আগের মতো আন্তরিকতা ও দলীয় দায়িত্ববোধ নেই। অনেকেই নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়, আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। এতে করে দলটির মাঠপর্যায়ের শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এর মধ্যেও সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফার একটি শক্ত ভোটব্যাংক এখনো সক্রিয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটব্যাংক জাপার জন্য কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করতে পারে।
প্রার্থী ও প্রতীকের লড়াই
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রংপুর-৩ আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। বিএনপির ধানের শীষ, জাতীয় পার্টির লাঙল এবং জামায়াতে ইসলামীর দাড়িপাল্লা—এই তিনটি প্রতীকই মাঠে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। কে কতটা ভোট কাটতে পারবে, তা নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল ও আলোচনা তুঙ্গে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত
বিএনপির নেতা শহিদুল ইসলাম মিজু বলেন, রংপুরে এবার মানুষ পরিবর্তন চায়। তৃণমূলের ঐক্যই আমাদের শক্তি।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ইয়াসির আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাকের মতে, সব সংকট সত্ত্বেও জাপার ভোটব্যাংক এখনো অটুট।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম কিবরিয়া বলেন, “জনগণের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিফলনই এবার ভোটে দেখা যাবে।
সব মিলিয়ে, রংপুর-৩ আসনে এবার নির্বাচন শুধু প্রার্থীর নয়, বরং রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে
প্রধান সম্পাদক : জুয়েল খন্দকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম রাশেদ হাসান
নির্বাহী সম্পাদক : গাজী ওয়ালিদ আশরাফ সামী
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হট-লাইন নাম্বার : ০১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ০১৯৬৭৯৯৯৭৬৬.
স্বত্ব © ২০২৬ দেশপত্র