শিল্পী আক্তার, রংপুর ব্যুরো :- রংপুরের বদরগঞ্জ থানায় ওসির কক্ষে কৃষক লীগ ও সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার উপস্থিতিতে এক সাংবাদিকের নামে মামলা নথিভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে রংপুরের সাংবাদিক সমাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ওসির অপসারণ এবং মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
গত ২৩ নভেম্বর সকালে বিষ্ণুপুর খাগড়াবন্দ এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দৈনিক পরিবেশের বদরগঞ্জ প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শাহ মনিরের পিতা ও বিএনপি’র সাবেক সভাপতি আব্দুল আজিজ শাহকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শওকত আলী ও সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তোফাজ্জল হোসেনসহ কয়েকজন আটক করে মারধর করে বলে অভিযোগ। এতে আব্দুল আজিজ গুরুতর জখমপ্রাপ্ত হন।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা শওকত ও তোফাজ্জলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। কিন্তু অভিযুক্তদের কেউ গ্রেফতার না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ২৫/২৬ নভেম্বর রাতের দিকে (সময় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে অসঙ্গতি) বদরগঞ্জ থানায় সাংবাদিক মনির ও তাঁর পিতাসহ আটজনের নামে একটি নতুন মামলা নথিভুক্ত হয়। বাদী করা হয় তোফাজ্জল হোসেনকে—যিনি নিজেই আগের মামলার ২ নম্বর আসামি, এবং এখন বিএনপি’র স্থানীয় নেতা হিসেবে পরিচিত।
এ মামলার সময় কৃষক লীগ নেতা বেলাল হোসেন লাভলু ও বাদী তোফাজ্জল হোসেনকে ওসির কক্ষে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
দৈনিক যুগান্তরের বদরগঞ্জ প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন— ২৫ নভেম্বর রাত ১২টার একটু আগে থানায় গিয়ে দেখি কৃষক লীগ নেতা লাভলু এবং তোফাজ্জল হোসেন ওসির রুম থেকে বের হচ্ছেন। পরে জানতে পারি সাংবাদিক মনিরের নামে মামলা নিলেন তারা। এটা নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।
অভিযোগ অস্বীকার করে বদরগঞ্জ থানার ওসি একেএম আতিকুর রহমান বলেন— এখানে প্রায় সাড়ে চার-পাঁচ লাখ মানুষ আছে। আমিতো আর সবাইকে চিনি না। থানায় কেউ আসলে আমি আসামিকে কিভাবে চিনবো? কৃষক লীগ নেতা বা তোফাজ্জল কেউই আমার রুমে আসেননি। তোফাজ্জল ভাগিনার মাধ্যমে এজাহার জমা দিয়েছেন।
সাংবাদিক মনির বলেন— আমার বাবাকে রক্তাক্ত করেছে, হত্যার চেষ্টা করেছে—সেই মামলার আসামিকে পুলিশ ধরছে না। বরং ওসি কৃষক লীগ নেতাকে পাশে বসিয়ে আমাকে প্রধান আসামি বানিয়ে মামলা নিলেন। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যদি এমন প্রকাশ্য ভূমিকা ওসিরা নেয়—তাহলে সাংবাদিকরা নিরাপত্তা পাবে কোথায়?
*পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া-*
রংপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) আবু সায়েম বলেন— বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন— ২৪ জুলাই পরবর্তী সময়ে চিহ্নিত দলীয় নেতারা এলাকায় থাকার কথা নয়। তাহলে তারা কীভাবে থানায় গিয়ে প্রভাব বিস্তার করে মামলা করালেন—এটা খতিয়ে দেখা হবে।
*সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভ-*
বদরগঞ্জ প্রেসক্লাব, রংপুর সিটি প্রেসক্লাব, রংপুর সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজ ও রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন–আরপিইউজে—সকলেই ওসির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বদরগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি আলতাফ হোসেন দুলাল বলেন— জামিন না নেওয়া আসামিকে নিয়ে ওসির রুমে বসে সাংবাদিকের নামে মামলা—এটাই প্রমাণ করে পুলিশ এখনো পুরনো কালচার থেকে বের হয়নি। অবিলম্বে ওসিকে অপসারণ করতে হবে।
রংপুর সিটি প্রেসক্লাব সভাপতি স্বপন চৌধুরী বলেন— জামিনহীন আসামি থানায় গিয়ে সাংবাদিকের নামে মামলা করবে—এটা মগের মুল্লুক ছাড়া আর কিছু নয়। কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
রংপুর সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজের সদস্য সচিব লিয়াকত আলী বাদল বলেন— ওসি সরাসরি আইনের বাইরে গিয়ে স্পর্ধা দেখিয়েছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার ও ওসিকে অপসারণ না করলে আন্দোলনে নামব।
রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন (RPUJ) সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেক বলেন— ওসি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ধারাবাহিকতা বহন করছেন। বিষয়টি বিএফইউজের বৈঠকের এজেন্ডায় তোলা হবে।
ঘটনাটি বর্তমানে রংপুর অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি, আসামির উপস্থিতিতে মামলা রেকর্ড, থানার ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব—এসব অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রধান সম্পাদক : জুয়েল খন্দকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম রাশেদ হাসান
নির্বাহী সম্পাদক : গাজী ওয়ালিদ আশরাফ সামী
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হট-লাইন নাম্বার : ০১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ০১৯৬৭৯৯৯৭৬৬.
স্বত্ব © ২০২৬ দেশপত্র