স্টাফ রিপোর্টার :- ময়মনসিংহ মহানগরীর কোতোয়ালি থানা এলাকাসহ আশপাশের অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা,প্রাণনাশের হুমকি ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার একাধিক অভিযোগে এক ব্যক্তিকে ঘিরে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযুক্তের নাম জাহাঙ্গীর ওরফে ‘সুন্দরী জাহাঙ্গীর’। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া তিনটি গুরুতর ঘটনা, ভিন্ন ভুক্তভোগী—কিন্তু অভিযুক্ত একই। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি সংগঠিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের কার্যক্রমের স্পষ্ট চিত্র। ঘটনা–১ : চাঁদার হুমকিতে বন্ধ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান! ২০২৫ সালের ২৩ জুন রাত আনুমানিক ১০টায় ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের পালপাড়ায় অবস্থিত মদিনাতুল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অনুপ্রবেশ করে জাহাঙ্গীর ও তার ১০–১৫ জন সহযোগী। ভুক্তভোগী মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা মো. আলামিন জানান, অভিযুক্তরা সরাসরি ও মোবাইল ফোনে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া,সন্ত্রাসী হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। চরম নিরাপত্তাহীনতায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা বন্ধ করে এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযুক্তের প্রভাব ও ভুক্তভোগীরা স্থানীয় না হওয়ায় তখন আইনের আশ্রয় নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঘটনা–২ : সরকারি সড়ক নির্মাণে বাধা,মারধর ও প্রশ্নবিদ্ধ পুলিশ!
২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ২টার দিকে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে চলমান আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কারিতাস মোড় পর্যন্ত সড়ক নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া হয়। বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান টুটুল অভিযোগ করেন,জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা চাঁদা দাবি করে এবং তাকে শারীরিকভাবে মারধর করে। ঘটনার পর ভোর ৪টায় কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১ ধারায় আদালতে পাঠায়। তবে পরদিনই তিনি জামিনে মুক্তি পান। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে,রাজনৈতিক তদবিরে অভিযুক্ত দ্রুত মুক্তি পায়, যার পরপরই এলাকায় ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
ঘটনা–৩ : সাংবাদিকের ওপর সশস্ত্র হামলা ও ডাকাতি! সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাতে। কোতোয়ালি থানার বলাশপুর এলাকায় এক সংবাদকর্মীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালায় জাহাঙ্গীর,মিলন সরকার,লুৎফর রহমানসহ ১০–১২ জন। ভুক্তভোগী সাংবাদিক মামুনুর রশীদ মামুন জানান,হামলাকারীরা তাকে মারধর করে ২টি ইজিবাইক ও নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়,ভিডিও ধারণ,সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলা এবং মামলা করলে খুন ও লাশ গুমের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আইন কী বলে: সুয়োমুটো মামলা বাধ্যতামূলক।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিনটি ঘটনাই আমলযোগ্য (Cognizable) ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC),১৮৯৮ অনুযায়ী—ধারা ১৫৪: আমলযোগ্য অপরাধে পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য। ধারা ১৫৬(১): ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়াই পুলিশ স্বপ্রণোদিতভাবে তদন্ত শুরু করতে পারে।
ধারা ১৫৭: গুরুতর অপরাধে তদন্ত শুরু করে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে হয়। এছাড়া দণ্ডবিধি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন,২০০৯ অনুযায়ী এসব অপরাধে পুলিশের সুয়োমুটো মামলা নেওয়া আইনগতভাবে বৈধই নয়,বাধ্যতামূলক।
বিশেষ বিশ্লেষণঃ একই অভিযুক্ত,একই ধরনের অপরাধ,ভিন্ন ভিন্ন ভুক্তভোগী—এই মিল কাকতালীয় নয়। এটি একটি সংগঠিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম,যা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম—তিনটি স্তম্ভকেই আঘাত করেছে। আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়,আর সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
প্রশ্ন উঠেছে কেন একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পৃথক মামলা হয়নি? কেন একজন গ্রেপ্তার হওয়ার পরপরই আবার এলাকায় সক্রিয়? সাংবাদিকের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় কেন দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? ময়মনসিংহের এই তিন ঘটনা শুধু স্থানীয় অপরাধ নয়—এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
প্রধান সম্পাদক : জুয়েল খন্দকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম রাশেদ হাসান
নির্বাহী সম্পাদক : গাজী ওয়ালিদ আশরাফ সামী
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হট-লাইন নাম্বার : ০১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ০১৯৬৭৯৯৯৭৬৬.
স্বত্ব © ২০২৫ দেশপত্র