
আজকের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে মুখের লাগাম খুলে গেছে, নৈতিকতা গৌণ হয়ে গেছে, আর “বক্তৃতার স্বাধীনতা”র নামে চরিত্রহনন ও কটূক্তিকে বৈধ করার অপচেষ্টা চলছে। সম্প্রতি আমীর হামজা নামক এক ব্যক্তির বক্তব্য ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু রাজনৈতিক শালীনতার প্রশ্ন নয়—এটি সরাসরি ইসলামের মৌলিক আদব ও আখলাকের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র, মরহুম আরাফাত রহমান কোকো—একজন মৃত মানুষ। তার নাম বিকৃত করে কটূক্তিমূলক বক্তব্য দেওয়া শুধু রুচিহীনতা নয়; ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুতর গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
প্রথম প্রশ্ন হলো—
ইসলামে কি কারো নাম বিকৃত করা, বিদ্রূপ করা বা ব্যঙ্গ করা বৈধ?
১. নাম বিকৃতি ও উপহাস সম্পর্কে কোরআনের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা
📖 সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১১
আরবি:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا يَسْخَرْ قَوْمٌۭ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُونُوا۟ خَيْرًۭا مِّنْهُمْ … وَلَا تَنَابَزُوا۟ بِٱلْأَلْقَٰبِ ۖ بِئْسَ ٱلِٱسْمُ ٱلْفُسُوقُ بَعْدَ ٱلْإِيمَٰنِ
অর্থ:
“হে ঈমানদারগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে—হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। … আর একে অপরকে উপনাম বা বিকৃত নামে ডেকো না। ঈমানের পর এমন নাম খুবই নিকৃষ্ট।”
➡️ “ولا تنابزوا بالألقاب”—এর অর্থ হলো কাউকে এমন নামে ডাকা, যা সে অপছন্দ করে বা অপমানজনক।
➡️ নাম বিকৃতি, ব্যঙ্গাত্মক নামকরণ—এই আয়াতের সরাসরি লঙ্ঘন।
অতএব, কোনো ব্যক্তির নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে বক্তব্য দেওয়া কোরআনের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত।
২. মৃত ব্যক্তির সম্মান: ইসলামে আরও কঠোর বিধান
ইসলাম শুধু জীবিত মানুষের সম্মান রক্ষা করেনি, মৃত মানুষের মর্যাদাকেও অলঙ্ঘনীয় ঘোষণা করেছে।
📜 হাদিস: সহিহ বুখারি (নং ১৩৯৩)
আরবি:
لَا تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَإِنَّهُمْ قَدْ أَفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوا
অর্থ:
“তোমরা মৃতদের গালি দিও না; তারা তো তাদের আমলের কাছে পৌঁছে গেছে।”
➡️ এখানে রাসূল ﷺ কোনো শর্ত দেননি—
➡️ রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, পরিবার—কিছুই ব্যতিক্রম নয়।
মরহুম আরাফাত রহমান কোকো একজন মৃত ব্যক্তি। তার নাম নিয়ে কটূক্তি করা মানে রাসূল ﷺ–এর সরাসরি নিষেধ অমান্য করা।
৩. অপ্রাসঙ্গিক ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য: মানসিক বিকৃতির আলামত?
ইসলাম বক্তব্যের শালীনতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করেছে।
📜 হাদিস: সহিহ বুখারি ও মুসলিম
আরবি:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
অর্থ:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে।”
➡️ অপ্রাসঙ্গিক, কুরুচিপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য—
➡️ এই হাদিস অনুযায়ী ঈমানের ঘাটতির লক্ষণ।
যে বক্তব্যের সঙ্গে বিষয়বস্তুর কোনো সম্পর্ক নেই, বরং উদ্দেশ্য শুধু অপমান করা—তা ইসলামি আখলাকের দৃষ্টিতে মানসিক বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ বললে অত্যুক্তি হয় না।
৪. লাগামহীন বক্তব্যের দায় কার?
ইসলাম শুধু ব্যক্তিকে নয়, নেতৃত্বকেও জবাবদিহির আওতায় আনে।
📖 সূরা আন-নিসা, আয়াত ৫৮
আরবি:
إِنَّ ٱللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا۟ ٱلْأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهْلِهَا
অর্থ:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানত তার যোগ্য লোকদের কাছে অর্পণ করার নির্দেশ দেন।”
যে ব্যক্তি বারবার বেফাঁস, অশালীন ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়—
তাকে প্রার্থী করা, তাকে প্রশ্রয় দেওয়া, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া—
এটি আমানতের খিয়ানত।
এই প্রশ্রয়ের ফলেই বক্তব্য আজ লাগামহীন।
৫. সম্মানহানি ও অপবাদ: কবিরা গুনাহ
📖 সূরা আল-হুমাযা, আয়াত ১
আরবি:
وَيْلٌۭ لِّكُلِّ هُمَزَةٍۢ لُّمَزَةٍۢ
অর্থ:
“ধ্বংস তার জন্য, যে লোকেরা পিছনে ও সামনে অপবাদ দেয়।”
নাম বিকৃতি, ব্যঙ্গ, কটাক্ষ—সবই হুমাযা-লুমাযার অন্তর্ভুক্ত।
উপসংহার: ইসলাম কাউকে এই অধিকার দেয়নি
ইসলাম কাউকে এই অধিকার দেয়নি যে—
মৃত মানুষের নাম নিয়ে কটূক্তি করবে
রাজনৈতিক ভিন্নমতের নামে ব্যক্তিগত অপমান করবে
অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য দিয়ে মানুষের আবেগে আঘাত করবে
আমীর হামজা বা যে কেউই হোক, ইসলামি মানদণ্ডে এই ধরনের বক্তব্য ক্ষমাযোগ্য নয়, যতক্ষণ না প্রকাশ্যে তওবা ও সংশোধন হয়।
রাজনীতি আসবে–যাবে,
কিন্তু কোরআন ও রাসূল ﷺ–এর আদব চিরস্থায়ী।
মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব—
ব্যক্তি নয়, নীতি বিচার করা।
দল নয়, দলিল মানা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে জিহ্বার হেফাজত করার তৌফিক দিন, আমিন।


