তৌহিদ ইসলাম, ঢাকা প্রতিনিধি :- একদা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে নিয়মিত চলাচল করত আধুনিক ডেমু (Diesel Electric Multiple Unit) ট্রেন। যাত্রীবান্ধব এই সেবাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল বড় আশা। কিন্তু বাস্তবতা আজ নির্মম—মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ২৩ জোড়া ডেমু ট্রেন নষ্ট ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। নির্ধারিত ৩০ বছরের আয়ুষ্কাল থাকা সত্ত্বেও ৫–৬ বছরেই এই ব্যর্থতা দেশের রেল ইতিহাসে নজিরবিহীন কেলেঙ্কারিতে পরিণত হয়েছে।
৯ বছর আগে তোলা একটি ছবিতে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা কুমিল্লা কমিউটার ডেমু ট্রেন এবং তার পাশেই সিল্ক সিটি এক্সপ্রেস দেখা যায়। সে সময় ডেমু ট্রেন দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করত—ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা–নরসিংদী, ঢাকা–কুমিল্লা, রাজশাহী–ঈশ্বরদীসহ ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ রুটে। স্বল্প দূরত্বে দ্রুত, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করাই ছিল এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
২০১৩ সালে চীনের CNR Tangshan কোম্পানি থেকে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩ জোড়া ডেমু ট্রেন কেনে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রথম দিকে এই ট্রেন যাত্রীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে থাকে। ধীরে ধীরে অধিকাংশ ট্রেন বিকল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো প্রকল্পই কার্যত অচল হয়ে যায়।
রেলওয়ের একাধিক সূত্র ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, দক্ষ জনবলের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণে চরম অবহেলা এবং ভয়াবহ দুর্নীতি। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না, ট্রেন কেনা হয়েছে অস্বাভাবিক উচ্চ দামে, এবং নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। অনেকেই এই কেলেঙ্কারিকে সরাসরি ‘সাগর চুরি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এত বড় আর্থিক ক্ষতির পরও আজ পর্যন্ত কেউ এই কেলেঙ্কারির দায় স্বীকার করেনি, হয়নি কার্যকর কোনো তদন্ত, কাউকে দেওয়া হয়নি শাস্তি। ফলে শত শত কোটি টাকার সরকারি অর্থ অপচয় হলেও জবাবদিহিতার কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি।
বর্তমানে প্রায় সব ডেমু ট্রেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, পার্বতীপুর ও ঈশ্বরদী রেল ইয়ার্ডে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। রোদ-বৃষ্টি ও অযত্নে এসব আধুনিক ট্রেন ধীরে ধীরে স্ক্র্যাপে পরিণত হচ্ছে। কোনো কোনো ট্রেনের যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ট্রেনে ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও প্রকল্পটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এই ব্যর্থতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ যাত্রীরা। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ডেমু ট্রেন ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও আরামদায়ক একটি মাধ্যম। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীচাপ বেড়েছে, লোকাল ট্রেনে ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে এবং সময় ও অর্থ উভয়ের ক্ষতি হচ্ছে।
রেল যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেমু প্রকল্পের ব্যর্থতা মূলত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফল। দায়ীদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় না আনলে ভবিষ্যতেও এমন শত শত কোটি টাকার প্রকল্প একই পরিণতির শিকার হবে।
নাগরিক সমাজ ও সুশাসনকামী সংগঠনগুলোর দাবি, এই প্রকল্প নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি অপচয় হওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডেমু ট্রেন প্রকল্প আজ বাংলাদেশের রেল খাতে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিহীনতার প্রতীক। ৬৫০ কোটি টাকার মতো বিশাল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় সম্পদ কয়েক বছরের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেলেও দায় নেই, বিচার নেই, শাস্তি নেই—এই বাস্তবতা দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার গভীর সংকটকেই স্পষ্ট করে তোলে
প্রধান সম্পাদক : জুয়েল খন্দকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম রাশেদ হাসান
নির্বাহী সম্পাদক : গাজী ওয়ালিদ আশরাফ সামী
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হট-লাইন নাম্বার : ০১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ০১৯৬৭৯৯৯৭৬৬.
স্বত্ব © ২০২৬ দেশপত্র