
নিজস্ব প্রতিবেদক :- কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, অবৈধ দখল ও বেআইনি শিল্পকারখানা পরিচালনার অভিযোগে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বাগমারা–হলদিয়া গ্রামের একটি বিতর্কিত রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই ঘটনায় স্থানীয় ক্ষোভ এখন প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় হলদিয়া গ্রামের আবুল মিয়ার দোকান সংলগ্ন একটি পুকুরের সাইট ওয়াল ও সংযোগ সড়ক নির্মাণকে ঘিরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা গ্রামের প্রধান সড়ক উপেক্ষা করে লালমাই উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহামুদা আক্তার এবং তার স্বামী, উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আবু তাহের রনি ব্যক্তিগত স্বার্থে একটি রাস্তা নির্মাণের উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত দম্পতির বাড়ির সামনের প্রধান সড়ক ইতোমধ্যে পাকা থাকা সত্ত্বেও বাড়ির পেছনে মাত্র ৫–৬টি পরিবারের চলাচলের সুবিধার কথা দেখিয়ে প্রকল্পের আবেদন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে তাহমিনা মিতু পিও বাজেট থেকে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ-দেন, যা এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। রাস্তার কাজ শুরু হতেই স্থানীয়রা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন।
তাদের বক্তব্য, যেখানে পুরো গ্রামের মানুষ ভাঙাচোরা ও কাদামাখা সড়কে চলাচল করতে হচ্ছে। সেখানে অল্প কয়েকটি পরিবারের সুবিধার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় চরম বৈষম্যমূলক ও অনৈতিক। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সংবাদ প্রকাশের পর বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত দম্পতি মাহামুদা আক্তার ও আবু তাহের রনি লালমাই ছেড়ে কুমিল্লা কোতোয়ালী থানাধীন ঠাকুরপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে আত্মগোপনে চলে যান। তারা প্রকাশ্যে এলাকায় আসা বন্ধ করে দিলেও বর্তমানে তাদেরকে বাঁচানোর জন্য ঠিকাদারি নিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ”র চেয়ারম্যান এমরান চেয়ারম্যান, মেম্বার হাবীব ও স্থানীয় প্রভাবশালী এবাদুল্লাহ। ইতিমধ্যে আবু তাহের রনি তার ও স্ত্রী”র দুর্নীতি করে গড়ে তোলা বিভিন্ন ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে ঘুরছেন ও পরিচালনা করেছেন। থানাকেও ম্যানেস করেছেন বলে জানা যায়।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দম্পতির সকল অপকর্ম বাস্তবায়নে প্রধান সহযোগীর ভূমিকা পালন করছেন একই এলাকার প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ এর এমরান চেয়ারম্যান, হাবীব মেম্বার ও এবাদুল্লাহ। এলাকাবাসীর দাবি, রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প থেকে শুরু করে অবৈধ দখল ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে উক্ত সিন্ডিকেট সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন এবং প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা দমন ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন।
অভিযোগের পরিধি শুধু রাস্তা নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন আবু তাহের রনি তার স্ত্রীর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অবৈধ সাবান ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন এবং জোরপূর্বক জামাল নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি দখল করে নেন। এছাড়াও অবৈধ ভাবে তৈল ফ্যাক্টরি, লবন ফ্যাক্টরি গড়ে তুলা, স্কুল কমিটিতে নিজের পরিবারের লোকদেরকে সদস্য করা ও স্কুলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাকরি প্রধান করার অভিযোগ সহ বিভিন্ন অবৈধ প্রজেক্ট এর অনুসন্ধান চলছে।
আবু তাহের রনির বাড়ির রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে এলাকাবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে বিতর্কিত প্রকল্প বাতিল করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ দখল ও বেআইনি শিল্পকারখানার সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তি—যাদের মধ্যে মাহামুদা আক্তার, আবু তাহের রনি ও তাদের সহযোগী আওয়ামিলীগ”র এমরান চেয়ারম্যান, হাবীব মেম্বার ও এবাদুল্লাহ নাম উঠে এসেছে—তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামের প্রধান সড়কটি দ্রুত সংস্কারের দাবিও জানান তারা।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, উন্নয়নের নামে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ কীভাবে সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকারকে উপেক্ষা করতে পারে। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদৌ সত্য উদঘাটনে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয় কি না।


